Ad Code

#

ট্যাংকের সামনে বাজারের ব্যাগ হাতে এক লোক

 

তিয়ানানমেন স্কয়ার, বেইজিং, চীন ১৯৮৯। আলোকচিত্র: স্টুয়ার্ট ফ্র্যাঙ্কলিন
তিয়ানানমেন স্কয়ার, বেইজিং, চীন ১৯৮৯। আলোকচিত্র: স্টুয়ার্ট ফ্র্যাঙ্কলিন

অতীত পাঠের অনেক ধরনের উপায় রয়েছে। তারিখ, দলিল, স্মৃতিচারণ বা বিবরণীর মধ্য দিয়ে যেমন, আবার এমন কিছু মুহূর্ত রয়েছে যাদের সমস্ত ভার, আবেগ ও বাস্তবতা সবচেয়ে সংক্ষেপে ধারণ করে কেবল একটি আলোকচিত্র। সময়ের সীমানা ভেদ করে টিকে থাকা এসব ছবির পেছনে থাকে একাধিক গল্প। এই ধারাবাহিকের প্রতিটি পর্বে আমরা তুলে ধরব এমনই কোনো বিশ্ববিখ্যাত আলোকচিত্রের অন্তরঙ্গ ইতিহাস।



বেইজিংয়ের আকাশ তখনো পুরোপুরি উত্তপ্ত হয়ে ওঠেনি। বসন্তের হালকা বাতাস তিয়ানানমেন স্কয়ারের বিস্তীর্ণ পিচের রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছিল। যেন সে নিজেও কিছু বলতে চায়, অথচ ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না। ১৯৮৯ সালের এপ্রিল মাস। ইতিমধ্যে চীনা রাজনীতিবিদ হু ইয়াওবাং মারা গেছেন। খবরটা প্রথমে শোক হয়ে আসে। অতঃপর ধীরে ধীরে তা রূপ নেয় প্রশ্নে।

হু ইয়াওবাং ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও সাধারণ মানুষের দিকে তাকাতে ভয় পাননি। ছাত্ররা তাঁকে মনে রেখেছিল, কারণ তিনি সবার কথা শুনতেন। তাঁর মৃত্যুর দিন, কয়েকজন ছাত্র ফুল হাতে স্কয়ারে এসেছিল। তারা ভেবেছিল তারা এসে নীরবে দাঁড়াবে, কিছুক্ষণ অবস্থানের পর মাথা নিচু করে ফিরে যাবে। কিন্তু শোকের নীরব ভাষা ভেদ করে চত্বর নীরব থাকেনি।

পরদিন আরও কিছু মানুষ এল। তাদের হাতে হাতে পোস্টার, কাগজে লেখা একাধিক প্রশ্ন—‘আমাদের ভবিষ্যৎ কোথায়?’ ‘দুর্নীতি কেন এত গভীরে?’ শোক ধীরে ধীরে রূপ নেয় দাবিতে। আর দাবি বরাবর রূপ নেয় শতকণ্ঠে।


১৯৮৯ সালের এপ্রিল মাস। ইতিমধ্যে চীনা রাজনীতিবিদ হু ইয়াওবাং মারা গেছেন। খবরটা প্রথমে শোক হয়ে আসে। অতঃপর ধীরে ধীরে তা রূপ নেয় প্রশ্নে। হু ইয়াওবাং ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও সাধারণ মানুষের দিকে তাকাতে ভয় পাননি।

মে মাস। মানুষের সঙ্গে হাজির হলো তাদের কণ্ঠের ঢেউ। শিক্ষার্থীদের পাশে এসে দাঁড়ান শ্রমিকেরা, যাঁদের মজুরি মুদ্রাস্ফীতির নিচে চাপা পড়েছে। জিনিসপত্র কিনে খাওয়ার মতো অবস্থা নেই, দ্রব্যমূল্য ক্রয়ক্ষমতায় অনেক বাইরে চলে গেছে। বুদ্ধিজীবীরা এলেন—তাঁরা, যাঁরা জানতেন শব্দ হারালে ইতিহাসও হারায়। এমনকি কিছু পুলিশ সদস্যও দূর থেকে দেখছিলেন নীরবে, দ্বিধান্বিত।




১৩ মে রাতে তিয়ানানমেন স্কয়ারের বাতাস বদলে গেল। শিক্ষার্থীরা অনশন শুরু করল। কেউ কেউ শুয়ে পড়ল ঠান্ডা পাথরের ওপর। তাদের চোখে ছিল জ্বর আর দৃঢ়তা। শহরের মানুষ খাবার নিয়ে এল, পানি নিয়ে এল। মায়েরা এসে ছেলেদের কপালে হাত রাখল। চত্বর তখন আর শুধু রাজনৈতিক মঞ্চ নয়, হয়ে উঠল এক বিশাল পরিবারের উঠান। আন্দোলনকারীরা সমস্বরে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, বাক্‌স্বাধীনতা এবং আরও বেশি গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবি জানাতে থাকে।

১৫ মে সোভিয়েত নেতা গর্বাচেভ এলেন। বিদেশি সাংবাদিকেরা ক্যামেরা বসালেন। বিশ্ব প্রথমবার পরিষ্কারভাবে দেখল, চীনের হৃদয়ে কী ঘটছে। টেলিভিশনের আলোয় ছাত্রদের মুখ উজ্জ্বল হলো, কিন্তু সেই আলো ক্ষমতার চোখেও পড়ল। ২০ মে সামরিক আইন জারি হলো।

প্রথমে ট্যাংক এল না। এল গুজব। তারপর সৈন্য। কিন্তু মানুষ সরে যায়নি। তারা বাস টেনে আনল, রাস্তার মাঝখানে দাঁড় করাল। হাত ধরে দাঁড়াল, মানুষে মানুষ জোড়া লাগিয়ে তৈরি করল মানববন্ধন। সেদিন রাতে সার্বিক অবস্থা দেখে অনেক সৈন্য থেমে গিয়েছিল। কেউ কেউ চোখ নামিয়ে নিয়েছিল। যেন তারা নিজের ভেতরেই কারও সঙ্গে লড়ছিল।


ভয় ধেয়ে আসছিল। ৩ জুন রাতে শহরের শব্দ বদলে গেল। দূরে ট্যাংকের গর্জন শোনা গেল। চাং’আন অ্যাভিনিউ দিয়ে তারা এগিয়ে এল, চারদিক থেকে এগিয়ে আসতে থাকল। গুলি ছোড়া হলো। কতেক মানুষ দৌড়াল, কতেক মানুষ পড়ে গেল। কেউ কেউ আবার হাত তুলে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলল, ‘গুলি কোরো না, আমরা তোমাদের ভাই।’

কিন্তু গুলি থামেনি।

৩ জুন রাতে শহরের শব্দ বদলে গেল। দূরে ট্যাংকের গর্জন শোনা গেল। চাং’আন অ্যাভিনিউ দিয়ে তারা এগিয়ে এল, চারদিক থেকে এগিয়ে আসতে থাকল। গুলি ছোড়া হলো। কতেক মানুষ দৌড়াল, কতেক মানুষ পড়ে গেল। কেউ কেউ আবার হাত তুলে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলল, ‘গুলি কোরো না, আমরা তোমাদের ভাই।’

রক্ত মিশে গেল ধুলোর সঙ্গে। বাসগুলো আগুনে জ্বলল। অ্যাম্বুলেন্সগুলো আটকে দেওয়া হলো।

আচানক সেদিনের রাতটি অস্বাভাবিকভাবে দীর্ঘ হয়ে গেল। তবু ভোরের আলো যখন ফুটল, তিয়ানানমেন স্কয়ার তখন খালি। কিন্তু শূন্য নয়, চারদিকে পড়ে আছে শব্দের ছায়া–উপস্থিত। পরদিন বলা হলো, কয়েক শ মানুষ মারা গেছে। কেউ বলল, হাজার। কেউ বলল, আরও বেশি। সংখ্যার মধ্যে সত্য হারিয়ে গেল, কিন্তু শোক বয়ে গেল প্রতিটি ঘরে।

ছাত্রনেতারা গ্রেপ্তার হলেন। কেউ পালালেন, কেউ লুকালেন। ঝাও জিয়াং, যিনি কথা বলতে চেয়েছিলেন, নিজের বাড়িতে আজীবনের জন্য নীরব হয়ে গেলেন। বই থেকে একটি অধ্যায় হঠাৎ মুছে গেলে যেমন হয়। ইন্টারনেট থেকেও ছবি উধাও হয়ে গেল।

কখনো ভোরে, কখনো সন্ধ্যায়, তিয়ানানমেনের পাথরগুলো এখনো মনে করে। পায়ের শব্দ, স্লোগানের প্রতিধ্বনি, অনশনের নিশ্বাস। আর সেই এক মানুষ, যিনি একদিন ট্যাংকের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন, হাতে বাজারের ব্যাগ নিয়ে। তিনি যেন এখনো সেখানে আছেন, চোখে চোখ রেখে দাঁড়িয়ে, বলছেন না কিছুই। কারণ, কিছু কথা চিৎকার করে বলতে হয় না। উপস্থিতি এবং অবস্থান বলে দেয় সব।


সকালটা অদ্ভুতভাবে শান্ত ছিল। চাং’আন অ্যাভিনিউ তখন খালি বলতে অস্বাভাবিক রকম খালি। আগের দিনের রাতের ধোঁয়া এখনো বাতাসে লেগে আছে। পোড়া রাবার আর বারুদের গন্ধ সূর্যের আলোয় ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। রাস্তার ধারে উল্টে থাকা বাসগুলো যেন ক্লান্ত প্রাণীর মতো পড়ে আছে। শহর নিশ্বাস নিচ্ছে, কিন্তু তাতেও সাবধানতা সবখানে।


লোকটা তখনো জানতেন না, এই কয়েক মিনিট তাঁর জীবনকে ইতিহাসে ঠেলে দেবে। তিনি বাজার থেকে ফিরছিলেন। দুই হাতে দুটি ব্যাগ—একটিতে চাল, আরেকটায় সবজি। মাথায় কোনো স্লোগান নেই, পকেটে কোনো লিফলেট নেই। গত কয়েক রাত ঘুম হয়নি ঠিকই, কিন্তু তিনি কোনো নেতা নন, কোনো বক্তাও নন। তিনি কেবল একজন মানুষ। সেই মানুষ, যাঁর শহর বদলে গেছে এক রাতে। হঠাৎ তিনি শব্দটা শুনলেন।

প্রথমে মনে হলো ভূমিকম্প। তারপর বুঝলেন, ট্যাংক। এক হালি! না, আরও। ধাতব শরীরের গর্জন ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। সূর্যের আলো ট্যাংকের গায়ে পড়ে চকচক করছে। রাস্তার মাঝখানে লোকটা কী মনে করে থেমে গেলেন। তাঁর সামনে ফাঁকা রাস্তা, পেছনে অদৃশ্য শহর। তিনি চাইলে সরে যেতে পারতেন। খুব সহজেই সম্ভব ছিল। এক পা ডানে, এক পা বাঁয়ে ফেলে। কেউ কিছু বলত না। কেউ মনে রাখত না। কিন্তু তিনি সরে গেলেন না। বরং দাঁড়িয়ে পড়লেন ঠিক লাইনের মাঝখানে। পথের বাধা হয়ে দাঁড়ালেন ট্যাংকগুলোর। লোকটির হাতে বাজারের ব্যাগ দুটো একটু দুলে উঠল। তাঁর বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা জোরে ধাক্কা দিচ্ছে, কিন্তু তাঁর পা জমে গেছে, দৃঢ়। ভয়ে নয়, হয়তো তিনি কিছু একটা বুঝে ফেলেছেন, সেই কারণে।


ট্যাংকগুলো লোকটির কাছে এসে থামল। প্রথম ট্যাংকটা সামান্য বাঁ দিকে ঘুরল, যেন তাকে পাশ কাটিয়ে চলে যাবে। লোকটা এক পা এগিয়ে গিয়ে আবার সামনে দাঁড়ালেন। ব্যাগের ভেতর চালের দানা খসখস করে শব্দ করল। ট্যাংক আবার থামল। কয়েক সেকেন্ড। এই কয়েক সেকেন্ডকে তুলনা করা যায় কয়েক যুগের সঙ্গে।

ট্যাংকগুলো লোকটির কাছে এসে থামল। প্রথম ট্যাংকটা সামান্য বাঁ দিকে ঘুরল, যেন তাকে পাশ কাটিয়ে চলে যাবে। লোকটা এক পা এগিয়ে গিয়ে আবার সামনে দাঁড়ালেন। ব্যাগের ভেতর চালের দানা খসখস করে শব্দ করল। ট্যাংক আবার থামল। কয়েক সেকেন্ড। এই কয়েক সেকেন্ডকে তুলনা করা যায় কয়েক যুগের সঙ্গে।


ক্র্যাকডাউন শুরু হওয়ার পরদিন বেইজিংয়ে চীনা সৈন্য এবং ট্যাংক একত্র হচ্ছে। আলোকচিত্র: জেফ ওয়াইডনার
ক্র্যাকডাউন শুরু হওয়ার পরদিন বেইজিংয়ে চীনা সৈন্য এবং ট্যাংক একত্র হচ্ছে। আলোকচিত্র: জেফ ওয়াইডনার

ট্যাংকের ভেতরে থাকা সৈনিকটি লোকটার মুখ দেখতে পেল কি না, কেউ জানে না। লোকটা নিজেও জানতেন না, তিনি কী বলবেন। তিনি কিছু বললেনও না। সব সময় কথা বলার দরকার হয় না। তিনি শুধু দাঁড়িয়ে ছিলেন। একজন মানুষ। একটি শরীর। অস্ত্রহীন। আর সামনে দাঁড়িয়ে একটি রাষ্ট্র।


হঠাৎ ভিড় থেকে দুজন মানুষ ছুটে এল। তারা লোকটিকে হাতে, কাঁধে হাত রেখে ধরল। হয়তো বলল, ‘চলো, এখন না।’ লোকটা কোনো প্রতিরোধ করলেন না। বাজারের ব্যাগ দুটো তখনো তাঁর হাতে, শক্ত করেই ধরে রেখেছেন, সব সময় যেমন ধরে নিয়ে বাড়িতে ফিরে যান। লোক দুটি তাঁকে রাস্তা থেকে সরিয়ে ফেলল।

কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তিনি হারিয়ে গেলেন ভিড়ের মধ্যে, শহরের ভেতরে, ইতিহাসের ফাঁকে। ট্যাংকগুলো আবার চলতে শুরু করল। আলোকচিত্রীর ক্যামেরা ছিল দূরে, উঁচুতে। ছবিটা ধরা পড়ল। পৃথিবী দেখল। সবাই প্রশ্ন করল, তিনি কে? তিনি কি বেঁচে আছেন? কিন্তু লোকটা কোনো উত্তর দিলেন না। হয়তো তিনি সেদিন বাড়ি ফিরেছিলেন। হয়তো ফিরতে পারেননি। হয়তো তিনি এখনো কোথাও বাস করছেন, বাজার করছেন, চুপচাপ বেঁচে আছেন। হয়তো তাঁর সন্তান জানেই না, তার/তাদের পিতা একদিন বাজারের ব্যাগ হাতে ট্যাংক থামিয়েছিলেন।

কিন্তু একটা বিষয় নিশ্চিত যে সেদিন তিনি ট্যাংকের সামনে নয়, দাঁড়িয়েছিলেন ভয়ের সামনে। আর ভয়, এক মুহূর্তের জন্য হলেও পিছু হটেছিল সেদিন।


ট্যাংক ম্যান, ১৯৮৯। আলোকচিত্র: স্টুয়ার্ট ফ্র্যাঙ্কলিন
ট্যাংক ম্যান, ১৯৮৯। আলোকচিত্র: স্টুয়ার্ট ফ্র্যাঙ্কলিন

ফটোসাংবাদিকতার ইতিহাসে খুব কম ছবি আছে, যেগুলো ‘ট্যাংক ম্যান’-এর মতো এতটা তীব্র ও নাড়া দেওয়া শক্তি বহন করে। ১৯৮৯ সালের ৫ জুন বেইজিংয়ে সংঘটিত সেই মুখোমুখি অবস্থানটি একাধিক আলোকচিত্রী ধারণ করলেও, স্টুয়ার্ট ফ্র্যাঙ্কলিনের প্রশস্ত অ্যাঙ্গেলের ফ্রেমিং এ ঘটনার এক অনন্য ও শীতলতর পটভূমি নির্মাণ করে। এই ছবি কেবল একটি মুহূর্তকে নথিবদ্ধ করেনি, এটি হয়ে উঠেছে রাষ্ট্রীয় শক্তির এক বিশাল ও নিষ্ঠুর যন্ত্রের বিরুদ্ধে একক মানুষের সংগ্রামের সর্বজনীন প্রতীক—একটি ভিজ্যুয়াল শর্টহ্যান্ড।


বেইজিং হোটেলের একটি বারান্দা থেকে তোলা ফ্র্যাঙ্কলিনের ছবিতে দেখা যায়, দুই হাতে বাজারের ব্যাগ ধরা এক নিঃসঙ্গ মানুষ, টাইপ–৫৯ ট্যাংকের সারিবদ্ধ বহরের ঠিক সামনে অটল দাঁড়িয়ে আছেন।

প্রশস্ত ফ্রেম ব্যবহার করে ফ্র্যাঙ্কলিন ধরেছেন চাং’আন অ্যাভিনিউয়ের বিস্তৃত, শূন্য প্রান্তর। এর ফলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে ফ্র্যাঙ্কলিনের ছবির সবচেয়ে হৃদয়বিদারক উপাদান সম্ভবত বাজারের ব্যাগ দুটি। এগুলো ঘটনাটিকে নামিয়ে আনে দৈনন্দিন জীবনের মাটিতে। লোকটি কোনো সশস্ত্র সৈনিক বা সংগঠিত বিদ্রোহী ছিলেন না, সম্ভবত বাজার সেরে বাড়ি ফেরার পথে এক সাধারণ নাগরিক, যিনি হঠাৎই সিদ্ধান্ত নেন রুখে দাঁড়ানোর। উপলব্ধি করেন, নিজের বিবেকের ওজন প্রাণভয়ের চেয়ে অনেক বেশি।

চীনা রাষ্ট্রীয় সেন্সরশিপ এড়াতে স্টুয়ার্ট ফ্র্যাঙ্কলিনকে ছবিটি একটি চায়ের বাক্সে লুকিয়ে পাচার করতে হয়েছিল। ঘটনার অল্প দিন পর ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড দ্য সানডে এক্সপ্রেস দাবি করে, ওই ব্যক্তি ছিলেন ওয়াং ওয়েইলিন, ১৯ বছর বয়সী এক ছাত্র। তবে এ নামটি কখনোই চীনা সরকার, মানবাধিকার সংগঠন কিংবা তাঁর কথিত পরিবার—কেউই নিশ্চিত করেনি।

মুখোমুখি অবস্থানের পর তাঁকে পুলিশ নয়, বরং আশপাশের সাধারণ লোকজনই দ্রুত সরিয়ে দিয়েছিল। এ কারণেই শেষ পর্যন্ত তাঁর ভাগ্যে কী ঘটেছিল সে সম্পর্কে মতগুলো চরমভাবে বিভক্ত:


রাষ্ট্রীয় শক্তির এক বিশাল ও নিষ্ঠুর যন্ত্রের বিরুদ্ধে একক মানুষের সংগ্রামের সর্বজনীন প্রতীক—একটি ভিজ্যুয়াল শর্টহ্যান্ড। বেইজিং হোটেলের একটি বারান্দা থেকে তোলা ফ্র্যাঙ্কলিনের ছবিতে দেখা যায়, দুই হাতে বাজারের ব্যাগ ধরা এক নিঃসঙ্গ মানুষ, টাইপ–৫৯ ট্যাংকের সারিবদ্ধ বহরের ঠিক সামনে অটল দাঁড়িয়ে আছেন।

কেউ কেউ মনে করেন, তিনি ভিড়ের মধ্যে মিশে গিয়ে বেঁচে যান এবং মূল ভূখণ্ড চীনে নামহীন জীবন যাপন করেন অথবা তাইওয়ানে পালিয়ে যান। ১৯৯০ সালে বারবারা ওয়াল্টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তৎকালীন চীনা কমিউনিস্ট পার্টির মহাসচিব জিয়াং জেমিন দোভাষীর মাধ্যমে বলেন, ‘আমার মনে হয় তাকে হত্যা করা হয়নি।’


বহু ইতিহাসবিদ আশঙ্কা করেন, পরবর্তী রাষ্ট্রীয় দমন–পীড়নের সময় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের ডেপুটি সহকারী ব্রুস হার্শেনসন দাবি করেন, মানুষটিকে ১৪ দিনের মাথায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

বহু মানবাধিকার সংগঠনের মতে, সবচেয়ে সম্ভাব্য চিত্র হলো তিনি গ্রেপ্তার ও কারাবন্দী হয়েছিলেন, কিন্তু সেই অস্থির সময়ের বিশৃঙ্খলা এবং রাষ্ট্রের গোপনীয়তার কারণে তাঁর নথিপত্র হয় হারিয়ে গেছে, নয়তো কখনোই প্রকাশ করা হয়নি।


আলোকচিত্র: স্টুয়ার্ট ফ্র্যাঙ্কলিন
আলোকচিত্র: স্টুয়ার্ট ফ্র্যাঙ্কলিন

স্টুয়ার্ট ফ্র্যাঙ্কলিনের স্মৃতিচারণা থেকে জানা যায়, ‘সেই দিনটির কিছু আগেই চীনা সেনাবাহিনী তিয়ানানমেন স্কয়ার পরিষ্কার করে ফেলেছিল। কিন্তু তারপরও কিছু সাধারণ মানুষ সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল তাদের সামনে, ঠিক গুলি ছোড়ার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ছিল সৈন্যদের দ্বৈত সারি, আর তাদের পেছনে অপেক্ষমাণ ছিল ট্যাংকের বহর। এই নিরস্ত্র মানুষগুলোর ওপর বারবার গুলি চালানো হয়। অন্তত বিশজন হতাহত হয়। যখন মৃত ও আহতদের দেহ সরিয়ে নেওয়া হচ্ছিল, তখন সেই মুখোমুখি অবস্থান ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসে এবং ট্যাংকের একটি বহর বাধা ভেঙে ধীরে ধীরে পূর্ব দিকে অগ্রসর হতে থাকে।


‘আর সেই ট্যাংকগুলোর পথেই কয়েক শ মিটার দূরে অপেক্ষা করছিল একজন মানুষ। পরনে সাদা শার্ট, গাঢ় রঙের প্যান্ট, হাতে দুটি বাজারের ব্যাগ। সম্পূর্ণ একা সে ট্যাংকগুলোর পথ রোধ করে দাঁড়িয়েছিল। চারপাশে ছিল আতঙ্কগ্রস্ত দর্শক দল আর বেইজিং হোটেলের প্রায় প্রতিটি তলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা প্রায় পঞ্চাশজন সাংবাদিক, ক্যামেরা ক্রু ও আলোকচিত্রী—সবাই নীরব বিস্ময়ে সেই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করছিল।’


স্টুয়ার্ট ফ্র্যাঙ্কলিন আরও লিখেছেন, ‘ঘটনাটি তিন মিনিটেরও কম সময় স্থায়ী হয়েছিল। ঘটনার পর বারান্দায় দাঁড়িয়ে “ভ্যানিটি ফেয়ার”-এর লেখক টি ডি অলম্যানের সঙ্গে কথোপকথন শুরু হয়। অলম্যান দৃঢ়ভাবে জোর দিয়ে বলেছিলেন, এই দৃশ্য গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। কিন্তু আমার মনে পড়ছিল ১৯৬৮ সালের প্রাগ ও ব্রাতিস্লাভার ছবি। যেখানে প্রতিবাদকারীরা নগ্ন বক্ষ নিয়ে রুশ ট্যাংকের সামনে দাঁড়িয়েছিল। জাপানি আগ্রাসনের সময় চীনের অনুরূপ ঘটনার কথাও মনে পড়ছিল। সেই তুলনায় “ট্যাংক ম্যান”-এর অভিজ্ঞতা আমার কাছে যেন অনেক দূরের, অনেক নিঃশব্দ কিছু বলে মনে হচ্ছিল।

‘পরদিন আমার ফিল্মের রিলগুলো একটি ছোট চায়ের বাক্সে ভরে গোপনে চীন থেকে বের করে আনা হয়। একজন ফরাসি ছাত্র সেগুলো প্যারিসে নিয়ে যায়। পরে ম্যাগনাম ফটোসের প্যারিস অফিসে স্লাইডগুলো প্রসেস করা হয়, কপি তৈরি হয় এবং সেখান থেকেই ছবিগুলো সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে।’






মুক্ত গদ্য থেকে আরও পড়ুন




Post a Comment

0 Comments

Close Menu