ভারতের উত্তরাখন্ড রাজ্যের কোটদ্বার এলাকায় এক বৃদ্ধ দোকানিকে হেনস্তা করতে দেখে উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের মবের (উচ্ছৃঙ্খল জনতা) বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন এক ব্যক্তি। ওই ঘটনার পর কোটদ্বারে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল মঙ্গলবার পুলিশ প্রধান সড়ক, বাজার ও জনসমাগমস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করেছে।
প্রতিবাদ জানানো ওই ব্যক্তির নাম দীপক কুমার। তিনি এখন হিন্দুত্ববাদীদের রোষানলে পড়েছেন। অবশ্য পুলিশ তাঁর নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিয়েছে।
পাউরি গাড়োয়াল পুলিশ বলছে, কোটদ্বার পৌর এলাকায় ‘শান্তি, নিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলা জোরদার করার লক্ষ্যে’ তারা নিরবচ্ছিন্নভাবে নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছে। পুলিশ এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘পুলিশের বিভিন্ন দল ওই এলাকায় নিয়মিত টহল দিচ্ছে। প্রয়োজনে বিভিন্ন জায়গায় তল্লাশি অভিযান চালাচ্ছে।’
পুলিশ আরও বলছে, সন্দেহভাজন ব্যক্তি, যানবাহন ও কর্মকাণ্ডের ওপর কড়া নজর রাখা হচ্ছে, যাতে কোনো অপ্রীতিকর বা আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নকারী ঘটনা প্রতিরোধে সময়মতো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
গত মঙ্গলবার দীপক কুমারের জন্মদিন থাকায় পুলিশ তাঁর জিম ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করেছে। কোটদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রদীপ নেগি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সাররা শহরে ঢুকতে শুরু করায় তাঁরা সাধারণ মানুষের প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়ানোর চেষ্টা করছি।’
গত ২৬ জানুয়ারি দীপক কুমার নামের ওই ব্যক্তি ৭০ বছর বয়সী এক মুসলিম দোকানিকে হিন্দুত্বাবদী মবের হাত থেকে রক্ষা করতে রুখে দাঁড়ান। ওই বৃদ্ধ পার্কিনসন রোগে আক্রান্ত ছিলেন। উগ্রবাদীরা তাঁকে দোকানের নাম থেকে ‘বাবা’ শব্দটি বাদ দিতে জোর করছিল।
‘কোনো অনুশোচনা নেই, কাউকে তো কথা বলতেই হবে’
বয়স্ক ব্যক্তিকে হেনস্তার ওই ঘটনার একটি ভাইরাল ভিডিওতে দীপককে ওই মবের মুখোমুখি হয়ে বলতে শোনা যায়, ‘আমার নাম মোহাম্মদ দীপক।’
৩৭ বছর বয়সী দীপক জানান, গত ২৬ জানুয়ারি তিনি এক বৃদ্ধ মুসলিম দোকানদারকে হেনস্তা হতে দেখেন। একদল লোক ওই বৃদ্ধকে তাঁর দোকানের নাম থেকে ‘বাবা’ শব্দটি মুছে ফেলতে চাপ দিচ্ছিল। দীপক তাঁদের বাধা দিলে সেই ভিডিওটি ভাইরাল হয়ে যায়।
এর ফলে দীপক যেমন প্রশংসিত হন, তেমনি উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের নজরেও চলে আসেন। গত শনিবার বজরং দলের বেশ কিছু সদস্য দীপকের কাছে যেতে চাইলে পুলিশ তাদের আটকে দেয়।
এ ঘটনায় এ পর্যন্ত তিনটি এফআইআর করা হয়েছে। প্রথম মামলার বাদী হেনস্তার শিকার দোকানি উকিল আহমেদ। দ্বিতীয় মামলাটি হয়েছে দীপক কুমার ও তাঁর বন্ধু বিজয় রাওয়াতের বিরুদ্ধে। কোটদ্বারের এক বাসিন্দা ওই মামলার বাদী। তৃতীয় মামলাটি করেছে পুলিশ। বজরং দলের অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পুলিশ বাদী হয়ে মামলাটি করেছে।
সোমবার ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর সঙ্গে আলাপকালে দীপক বলেন, ‘আমি নিজেকে “মোহাম্মদ দীপক” বলেছিলাম। কারণ, সেটিই ছিল সেই সময়ের সঠিক প্রতিবাদ। আমি শুধু ঈশ্বরের কাছে দায়বদ্ধ। ধর্মের কারণে আক্রান্ত হওয়া একজন মানুষের পাশে দাঁড়ানো মানবিক কাজ ছিল। এই প্রতিবাদ বা বিক্ষোভে আমি মোটেও বিচলিত নই।
পুলিশ শহরের গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল স্থানে নজরদারি বাড়িয়েছে। প্রশাসন নিশ্চিত করছে, যাতে সাধারণ মানুষের কোনো অসুবিধা না হয় এবং সবার মধ্যে সম্প্রীতি বজায় থাকে। মঙ্গলবার দীপক জানান, পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে।
রাজনৈতিক সংঘাত
রাজ্যে শান্তি নষ্ট করার চেষ্টার অভিযোগে বিজেপি ও কংগ্রেস একে অপরকে আক্রমণ করেছে। এ ঘটনায় রাহুল গান্ধীর মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বিজেপি রাজ্য সভাপতি মহেন্দ্র ভাট একে ‘দুর্ভাগ্যজনক’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, রাহুল গান্ধীর মন্তব্য ‘দেবভূমি’র (উত্তরাখণ্ড) শান্ত পরিবেশ নষ্ট করার একটি পরিকল্পিত চেষ্টা।
বিজেপির সভাপতি দাবি করেন, স্থানীয় কংগ্রেস নেতাদের নেতিবাচক ভূমিকা ও বিষয়টিকে অহেতুক তিলকে তাল করার চেষ্টা স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নে সরকার কোনো শিথিলতা দেখাবে না এবং জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করছে।
বিজেপি এই ঘটনাটি আগে থেকে সাজানো কি না, তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছে।
অন্যদিকে, কংগ্রেস প্রশ্ন তুলেছে, যারা দীপককে গালিগালাজ ও হেনস্তা করল তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো কেন দীপক কুমার ও বিজয় রাওয়াতের বিরুদ্ধে মামলা করা হলো। এ ছাড়া সমাজবিরোধীদের বিরুদ্ধে কেন কেবল ‘অজ্ঞাত পরিচয়’ হিসেবে মামলা করা হয়েছে, তা নিয়েও তারা সরব।
রাজ্য কংগ্রেসের সহসভাপতি সূর্যকান্ত ধাসমানা বলেন, এটি পরিষ্কার, বিজেপি সরকারের প্রশ্রয়েই রাজ্যে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ ঘটানো হচ্ছে।
ধাসমানা ত্রিপুরায় ছাত্র হত্যা ও কাশ্মীরের এক শাল বিক্রেতাকে মারধরের উদাহরণ টেনে বলেন, ক্ষমতা ধরে রাখতে শাসকদল ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি করছে এবং সমাজবিরোধীদের ছাড় দিচ্ছে।

0 Comments