হলিউড অভিনেতা ও মার্ভেল সুপারহিরো ‘থর’ চরিত্রে জনপ্রিয় অভিনেতা ক্রিস হেমসওয়ার্থ জানিয়েছেন, আলঝেইমার রোগের জেনেটিক ঝুঁকির তথ্য প্রকাশ করার আগে তিনি গভীর দ্বিধায় ছিলেন। তাঁর আশঙ্কা ছিল, এই খবর প্রকাশ্যে এলে দর্শক ও ইন্ডাস্ট্রি তাঁকে আগের মতো অ্যাকশন তারকা বা মার্ভেল হিরো হিসেবে বিশ্বাস করবে কি না।
দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে হেমসওয়ার্থ বলেন, ‘আমি ভাবছিলাম, আমি কি মানুষকে খুব বেশি কাছে ঢুকতে দিচ্ছি? তারা কি এরপর আর আমাকে অ্যাকশন তারকা বা মার্ভেল চরিত্র হিসেবে বিশ্বাস করবে? আমি কী চাই, মানুষ আমার ভয় আর অনিশ্চয়তার কথা এতটা জানুক?’
জেনেটিক ঝুঁকির কথা যেভাবে সামনে আসে ২০২২ সালে ডিজনি প্লাসের তথ্যচিত্র সিরিজ ‘লিমিটলেস’-এর একটি পর্বে ক্রিস হেমসওয়ার্থ প্রথম প্রকাশ করেন, তাঁর শরীরে একটি জিনের দুটি কপি রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, এই জিন আলঝেইমার রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়। চিকিৎসকদের মতে, এর ফলে হেমসওয়ার্থের আলঝেইমারে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা সাধারণ মানুষের তুলনায় আট থেকে দশ গুণ বেশি।
এই রোগের সঙ্গে তাঁর পারিবারিক সম্পর্কও রয়েছে। হেমসওয়ার্থের দাদা আলঝেইমারে আক্রান্ত ছিলেন। আর গত বছর তিনি জানান, তাঁর বাবাও বর্তমানে এই রোগের সঙ্গে লড়ছেন।
বাবার অসুস্থতা ও ক্যারিয়ারে ধীরগতি
দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হেমসওয়ার্থ বলেন, বাবার আলঝেইমার রোগ ধরা পড়ার পর থেকেই তিনি জীবনের গতি কিছুটা কমিয়ে এনেছেন। তিনি বলেন, ‘আগের মতো দৌড়ে এগিয়ে যাওয়ার তাগিদটা অনেকটাই কমে গেছে। জীবনের ভঙ্গুর দিকগুলো এখন বেশি করে চোখে পড়ে। ভাবতে শুরু করি, আমার বাবা তো চিরদিন থাকবেন না। আর আমার সন্তানদের বয়স এখন ১১ ও ১৩। যে সময় তারা আমাদের বিছানায় এসে ঘুমানোর জন্য ঝগড়া করত—সেই সময়গুলোও আর নেই।’
এই বাস্তবতাই তাঁর কাজ বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলেছে। আগে যেখানে আর্থিক দিকটাই বড় বিষয় ছিল, এখন তিনি বেশি করে ব্যক্তিগত ও মানসিকভাবে অর্থবহ চরিত্রের দিকে ঝুঁকছেন।
টাকা নয়, এখন গুরুত্ব পাচ্ছে ব্যক্তিগত অনুভূতি হেমসওয়ার্থ স্বীকার করেন, একসময় তিনি অনেক সিদ্ধান্তই নিতেন অর্থনৈতিক বাস্তবতার কথা ভেবে।
হেমসওয়ার্থ বলেন, ‘আমি ভাবতাম, আমি তো শূন্য থেকে এসেছি। এত বড় অঙ্কের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ার মতো আমি কে? এমন কাজও করতাম, যেগুলো হয়তো সৃজনশীলভাবে সবচেয়ে বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত ছিল না। কিন্তু ভাবতাম, এতে মা–বাবার বাড়ির খরচ চালাতে পারব, আত্মীয়দের সাহায্য করতে পারব।’
এখন সেই দৃষ্টিভঙ্গিতে এসেছে পরিবর্তন। ব্যক্তিগতভাবে ছুঁয়ে যায়—এমন গল্প ও চরিত্রই এখন তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বাবাকে নিয়ে ব্যক্তিগত তথ্যচিত্র ২০২৫ সালে মুক্তি পাওয়া হেমসওয়ার্থের তথ্যচিত্র ‘আ রোড ট্রিপ টু রিমেম্বার’ পুরোপুরি তাঁর বাবার আলঝেইমার রোগকে কেন্দ্র করে তৈরি। অভিনেতা জানান, এই প্রজেক্টটি তাঁর জন্য ছিল ভীষণ ব্যক্তিগত। ‘এটা ছিল আমার বাবার প্রতি ভালোবাসার চিঠির মতো,’ বলেন হেমসওয়ার্থ। তিনি আরও বলেন, ‘এ কাজটি কিছু সময়ের জন্য তাঁকে মানসিকভাবে শক্ত করেছিল। যেসব স্মৃতি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছিল, সেগুলোকে আবার নাড়িয়ে দিয়েছিল।’
‘এটা কোনো নিশ্চিত শাস্তি নয়’ ২০২২ সালে জেনেটিক ঝুঁকির কথা প্রকাশ করার সময় হেমসওয়ার্থ স্পষ্ট করে বলেছিলেন, এটি কোনো নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী নয়। তিনি তখন বলেছিলেন, ‘এটা এমন নয় যে আমাকে অবসরপত্র ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটা নিশ্চিতভাবে আলঝেইমার হবে—এমন কোনো বিষয় নয়। তবে ঝুঁকির ইঙ্গিত অবশ্যই শক্ত।’
তবে ২০২৪ সালে ভ্যানিটি ফেয়ারকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হেমসওয়ার্থ সংবাদমাধ্যমের একাংশের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেন। অনেক শিরোনামে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল, যেন তাঁর আলঝেইমার হওয়া অবশ্যম্ভাবী।
হেমসওয়ার্থ বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগত একটি বিষয় নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছিলাম। বারবার বলেছি, এটা কোনো মৃত্যুদণ্ড নয়। কিন্তু অনেক জায়গায় খবর হলো—আমার ডিমেনশিয়া হচ্ছে, আমি নাকি জীবন নিয়ে নতুন করে ভাবছি, অবসর নিচ্ছি। এটা আমাকে সত্যিই বিরক্ত করেছিল।’
সামনে বড় পর্দায় থর হিসেবে ফেরা
চলতি মাসের ১৩ ফেব্রুয়ারি অ্যামাজন এমজিএম থেকে মুক্তি পাচ্ছে হেমসওয়ার্থ অভিনীত ‘ক্রাইম ১০১’। এর পাশাপাশি তিনি আবারও থর চরিত্রে ফিরবেন মার্ভেলের নতুন ছবি ‘অ্যাভেঞ্জার্স: ডুমসডে’তে, যা মুক্তি পাবে আগামী ১৮ ডিসেম্বর।



0 Comments