যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল জোটের সঙ্গে ইরানের সংঘাত আধুনিক যুদ্ধের নতুন একটি দিক সামনে নিয়ে এসেছে। তা হচ্ছে, কোটি কোটি ডলারের যুদ্ধবিমানের চেয়ে সস্তায় বানানো ড্রোন যুদ্ধের মাঠে হয়তো বেশি কার্যকর।
এক সপ্তাহ আগে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে এখন প্রায় একই ধরনের দুটি অস্ত্র আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। সেগুলো হলো ইরানের ড্রোন শাহেদ–১৩৬ এবং যুক্তরাষ্ট্রের লুকাস (লো কস্ট আনক্রুড কমব্যাট অ্যাটাক সিস্টেম)। মার্কিন সমরাস্ত্রের ভান্ডারে নতুন সংযোজন এই লুকাস।
ফোর্বস সাময়িকীর প্রতিবেদন অনুযায়ী, লুকাস সরাসরি ইরানের ড্রোনের নকশার অনুকরণ করে বানানো হয়েছে। ইরানের মতো এখন যুক্তরাষ্ট্রও এই ড্রোন বিপুল সংখ্যায় তৈরি করছে। তেহরানের জন্য হতাশার বিষয় হলো, তাদের উদ্ভাবন করা একটি অস্ত্র এখন তাদেরই বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে।
আসল খেলা সংখ্যায়
এমন নয় যে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি বলে শাহেদ–১৩৬ ড্রোন যুদ্ধের হিসাব বদলে দিচ্ছে; বরং এটি খুবই সস্তায় এবং কম সময়ে বিপুল সংখ্যায় তৈরি করা যায়।
একটি শাহেদ–১৩৬ ড্রোন তৈরি করতে ইরানের খরচ হয় ১০ থেকে ৫০ হাজার মার্কিন ডলার।
খবর অনুযায়ী, রাশিয়াও প্রতিবছর তাদের নিজস্ব সংস্করণের লাখো ড্রোন তৈরির পরিকল্পনা করছে।
ত্রিভুজাকৃতির নকশার কারণে এর কাঠামোর আকার অপেক্ষাকৃত ছোট, এতে এর সংযোজনের প্রক্রিয়া সহজ ও সস্তা হয়ে গেছে।
প্রায় ১০ লাখ ডলার মূল্যের একেকটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করার পরিবর্তে ইরান এখন একযোগে শত শত ড্রোন উৎক্ষেপণ করতে পারে, যা প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে সক্ষম।
প্রথম ছয় দিনে শাহেদ যা দেখাল
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোয় হামলা চালাতে শত শত ড্রোন উড়িয়েছে।
শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের মূল শক্তি হলো একসঙ্গে অনেকগুলো উৎক্ষেপণ করা যায়, ২ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত উড়ে গিয়ে আঘাত হানতে পারে, কম উচ্চতা দিয়ে উড়ে যায় বলে রাডার এড়াতে পারে, সর্বোপরি সস্তা।
তবে শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের কিছু দুর্বলতাও রয়েছে। যেমন এটার গতি কম, ঘণ্টায় ১৮৫ কিলোমিটার। ইঞ্জিনে শব্দ হওয়ার কারণে সেগুলো সহজে শনাক্ত হয়ে যায়, প্রতিপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় ধ্বংস হওয়ার হার অনেক বেশি।
লুকাসে জবাব যুক্তরাষ্ট্রের
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, একটি লুকাস তৈরি করতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৩৫ হাজার ডলার খরচ হয়। এর নকশা এমনভাবে করা হয়েছে যে এগুলো বড় আকারে একযোগে আক্রমণ করতে পারে।
নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত ড্রোনগুলো ওড়ার সময় একে অন্যের সঙ্গে সমন্বয় করতে পারে।
এটি এমন একটি অস্ত্র, যেটি সস্তায় এবং বিপুল সংখ্যায় তৈরি করা যায়। ফলে পেন্টাগন তাদের যুদ্ধকৌশলে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। কারণ, যুদ্ধ করতে গিয়ে এমন সস্তা অস্ত্র অনেক পরিমাণে ধ্বংস হলেও ক্ষতি কম হয়।
লুকাস নিয়ে যা জানা যায়
লুকাস দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র হামলা শুরু করেছে সম্প্রতি। উপসাগরে থাকা মার্কিন রণতরি থেকে সেগুলো উৎক্ষেপণ করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত সেগুলো ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকেন্দ্রে হামলা এবং রাডার–ব্যবস্থা ধ্বংসে ব্যবহার করা হচ্ছে। লুকাস নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সংযুক্ত থেকে সমন্বিতভাবে আক্রমণ করছে।
ইরানের শাহেদ–১৩৬, নাকি যুক্তরাষ্ট্রের লুকাস—অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র হিসেবে কোনটি সেরা, আজকের দিনে সেটি বড় প্রশ্ন নয়; বরং উভয় পক্ষই এখন একই ধরনের অস্ত্র ব্যবহারের ধারণার দিকে এগোচ্ছে। দামি ক্ষেপণাস্ত্রের বদলে সস্তা এবং বিপুল সংখ্যায় উৎপাদন সম্ভব আত্মঘাতী ড্রোন যুদ্ধে নতুন আতঙ্কের নাম হয়ে উঠছে।




0 Comments